যে লোকটির জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারলো তাঁর নাম মুহম্মদ আলি জিন্নাহ'- বিমালানন্দ শাসমল
আজ মরহুম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু দিবস। বাংলাদেশে জিন্নাহ চর্চা সেভাবে হয় না। যে 'অভিযোগে' তাঁকে আমরা খারিজ করেছি তারচেয়েও বড় বড় 'অভিযোগ' নিয়ে অন্যদের আমরা নিজেদের মাথার ওপর বসিয়েছি। অথচ তাঁর অবদান ছাড়া আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ত ভারতেরই অঙ্গরাজ্য হত। এই সম্পর্কে ভারতীয় ইতিহাসবিদ বিমালানন্দ শাসমল লিখেন,
''১৯৪৭-এর ২০শে জন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ এসেম্বলির অধিবেশন বসলো সদস্যদের মতামত জানাবার জন্য যে, তাঁরা ভারতীয় কনস্টিটিউয়েণ্ট এসেম্বলিতে যোগ দেবেন, না নতুন ও পৃথক কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিতে যোগ দেবেন। এসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সদস্যেরা একযোগে ভোট দিলেন, বাংলা ভাগ করা চলবে না; তাঁরা ভারতীয় কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিতে যোগ দেবেন না, নতুন ও পৃথক কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিতে যোগ দেবেন। এই নতুন ও পৃথক কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিই হোলো পাকিস্তান কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি। বাংলার মসলমান সদস্যরা সেদিন স্বেচ্ছায় অন্যের বিনা প্ররোচনায় নিজেদের স্বাধীন চিন্তায় পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন। কাজেই ১৯৭১ সালে আমরা যখন বললাম যে, পাকিস্তান জবরদস্তি করে পূর্ব বাংলা দখল করে বসে আছে, তখন আমরা সর্বতোভাবে অসত্য কথা বলেছিলাম।
সারা ভারতের বড় বড় নেতাদের অনুসরণে কলকাতা হাইকোর্টের বড় বড় অনেক ব্যারিষ্টার মিটিং করে এই অসত্যটি চালু করেছিলেন। পূর্ব বাংলার মসলমানরা ১৯৪৭-এ স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে যোগ দিয়ে পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে নিজেদের ভাগ্য রচনা করেছিলেন। তারপর হঠাৎ একদিন সকালে উঠে আমরা স্বাধীন বলা মাত্র পাকিস্তান যদি সেটা স্বীকার করতে রাজি না হয়, তাহলে আইনের দিক থেকে পাকিস্তান অন্যায় কিছু করে নি। আমাদের দেশে আমরাও কাশ্মীর ও মিজো-নাগাদের ক্ষেত্রে সেই রকম ব্যবহারই করেছি। তবে পূর্ব বাংলার মসলমানরা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছিলেন এবং তার জন্য লড়াই করতে চেয়েছিলেন। এটাকে ওয়ার অফ সিসেশন আলাদা হওয়ার যুদ্ধ নিশ্চয় বলা চলে, কিন্তু স্বাধীনতার যুদ্ধ যাকে সাধারণত বলা হয়, বাংলাদেশের যুদ্ধকে তাই বলা ঠিক নয়।
বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দেবার জন্য আমরা ভারতীয়রা কৃতিত্বের দাবি করি এবং শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে সেইজন্য এই সময়ে এশিয়ার মুক্তি সূর্য বলেও অভিহিত করা হোতো। কিন্তু বিনীতভাবে বলতে চাই - যে লোকটির জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারলো তাঁর নাম মুহম্মদ আলি জিন্না।
১৯৪৭ সালের ২০শে জুন পূর্ব বাংলার মুসলমানরা জিন্নার আহ্বান অগ্রাহ্য করে যদি পাকিস্তানে যোগ না দিতেন এবং ভারতে যোগ দিতেন এবং তারপর দশ-বিশ বছর বাদে যে-কারণে পাকিস্তান হতে বিচ্ছিন্ন হতে চাইলেন অর্থাৎ ভাষা পার্থক্যের জন্য ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা লাভ করতে চাইতেন, তাহলে আমরা বাঙালিরা কি ফুলের মালা দিয়ে পূজা করতাম, না রাস্তায় গুলি করে মারার দাবি জানাতাম? প্রায় একই কারণে শেখ আব্দুল্লাকে কত বছর কারাগারে থাকতে হয়েছিল, নিশ্চয়ই সেকথা কেউ ভোলেন নি। পাকিস্তানে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে তারপর পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবি জানালে পাকিস্তান পূর্ব বাংলায় যে অত্যাচার করেছিল, আমাদের ভারতবর্ষে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে তারপর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবি জানালে ভারতবর্ষ পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি না হোক কম অত্যাচার করতো না।
মিজো-নাগাদের উপর আমরা যে অত্যাচার করেছিলাম, পৃথিবীর লোক কোনোদিন সে সংবাদ জানতে পারবে না। এবং ভারতের মত শক্তিশালী দেশের সংগে লড়াই করবার জন্য ক্ষুদ্র পাকিস্তান বা পৃথিবীর কোনো দেশের কার্যকরী সাহায্য পূর্ব বাংলার লোকেরা পেতেন না। ভাগ্যবশত পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল, তাই খুব সহজেই স্বাধীন হতে পারলো - না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দূর অস্ত হয়ে থাকতো। সেই জন্যই বললাম, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা মুহম্মদ আলি জিন্নার ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল বলেই সহজে স্বাধীন হোলো।"(১)
ভারতীয় উপমহাদেশে সংখ্যালঘুর অধিকার আদায়ের অন্যতম পথিকৃৎ জিন্নাহ'র ভুলত্রুটি মাফ করে আল্লাহ্ যেন জান্নাতে উত্তম জায়গা দেন।
নোটঃ
(১) বিমালানন্দ শাসমল, ভারত কী করে ভাগ হলো, হিন্দুস্তান বুক সার্ভিস, কলকাতা,১৯৯১, পৃষ্ঠা, ১৬০-১৬১)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন